আজ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ভাষা শহিদদের রক্তে রঞ্জিত সেই অমর একুশে আজ। নিজ মায়ের শেখানো ভাষায় কথা বলার প্রয়াসে প্রতিবাদি ছাত্র জনতাকে করতে হয়েছিল সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। এটি কেবলই আমাদের শোকের দিন নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের এক উজ্জ্বল মাইলফলক।
ইতিহাস বলে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সংখ্যাগুরু বাঙালির ভাষাকে উপেক্ষা করে যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র চলে, তখনই দানা বাঁধে প্রতিরোধ। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চরম আকার ধারণ করে।
সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নেমে এলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এক রাতের মধ্যে গড়ে তোলা হয় প্রথম শহীদ মিনার, যা ছিল প্রতিবাদের এক অনন্য প্রতীক। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।
একুশের চেতনা আজ আর কেবল বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা: আজ সারাবিশ্বে বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষার প্রেরণা দেয় এই দিনটি।
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ: বাঙালির সকল গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল একুশের চেতনা।
গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট: বিশ্বের ১৯৩টি দেশে আজ এই দিনটি নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পালিত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায়, আজকের এই বিশেষ দিনে একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্র ও জনগণের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যাপক প্রস্তুতি। রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
১২টা ৪০ মিনিট থেকে জনসাধারণের জন্য বেদী উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অবস্থিত শহিদ মিনারে যথাযথ মর্যাদায় শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
পাশাপাশি, রাজধানীসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
শামসুর রাহমান-এর পঙক্তিতে:
“শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি পাথর
যেন আমার হৃদপিণ্ড।
আমি সেই পাথরকে ঘষে ঘষে
আমার আত্মার উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিই।”
আল মাহমুদ-এর পঙক্তিতে:
“ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।”
আমাদের কবি ও লেখকদের কলমে একুশ ধরা দিয়েছে দ্রোহ ও মমতায়।কালের পরিক্রমায় যা আজও চির অম্লান।
একুশের এই চেতনা আমাদের শেখায় মাথা নত না করার অমর শিক্ষা। ১৯৫২-এর সেই রক্তধারা আজও আমাদের ধমনীতে বহমান, যা আমাদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে এবং অন্যের ভাষাকে শ্রদ্ধা করতে সর্বদা উদ্বুদ্ধ করে।
ইকরামুল হাসান 

















