শহরটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে,
ক্লান্ত হর্নের শব্দ হারিয়ে গেছে বাতাসে,
রাস্তাগুলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলছে, “অবশেষে একটু বিশ্রাম জুটলো।”
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ছুটিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরেছেন লাখো মানুষ। বছরের অধিকাংশ সময় যানজট আর কোলাহলে বন্দি থাকা কংক্রিটের এই শহর এখন যেন নিজেকেই নতুন করে খুঁজে পাচ্ছে নিঃশব্দ, ধীর, আর কিছুটা স্বস্তির।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) শহরের শ্যামলী থেকে মহাখালী, বিজয়সরণি থেকে তেজগাঁও, যেখানেই চোখ যায়, সেখানে এক অন্য ঢাকার দেখা মেলে। যে সড়কগুলোতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়, আজ সেখানে গাড়ি চলছে নিরবচ্ছিন্ন গতিতে। নেই সেই বিরক্তিকর হর্ন, নেই অস্থিরতা, শুধু ফাঁকা পথ আর দ্রুত যাত্রা।
গণপরিবহনও যেন এই নীরবতার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। অনেক সময় পরপর কয়েকটি বাস চলাচল করছে, কিন্তু যাত্রী নেই বললেই চলে। আলিফ পরিবহনের সহকারী রাসেল বলেন,
“সকাল থেকে গাড়ি চালাচ্ছি, কিন্তু যাত্রীই পাচ্ছি না। তেলের খরচও উঠছে না। সব সিট ফাঁকা পড়ে আছে।”
অন্যদিকে, বিজয় সরণি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলমগীর হোসেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেও বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।
“১০-১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি, কোনো বাস পাচ্ছি না,” জানালেন তিনি।
এই বৈপরীত্যই যেন আজকের ঢাকার বাস্তবতা যেখানে রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু যাত্রা সবসময় সহজ নয়।
সিএনজি চালক লিমনের চোখে এই পরিবর্তন স্বস্তির।
তিনি বলেন, “জ্যাম নেই, তাই দ্রুত যাতায়াত করতে পারছি। যাত্রী কম, কিন্তু বাস কম থাকায় কিছু যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে।”

শুধু যানবাহন নয়, মানুষের উপস্থিতিও কমে গেছে চোখে পড়ার মতো। ব্যস্ত ফুটপাতগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। চায়ের দোকান, ছোটখাটো স্টল সবকিছুতেই এক ধরনের স্থিরতা। শহরের চিরচেনা ব্যস্ততা যেন সাময়িক ছুটিতে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি বছরের এই সময়টিই ঢাকার প্রকৃত চিত্রকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দেয়। যখন মানুষের চাপ কমে, তখনই বোঝা যায় শহরের অবকাঠামো আসলে কতটা সক্ষম। একই সঙ্গে এটি নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ মার্চ বাংলাদেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এর আগে এই কয়েকদিন ঢাকার এই শান্ত রূপই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানী আজ যেন এক বিরল ছুটিতে নিজের জন্য, নিজের মতো করে এক ক্ষণস্থায়ী নীরবতায় রুপ নিয়েছে। ঈদের পর আবার ফিরবে মানুষ, ফিরবে কোলাহল, ফিরবে সেই পুরোনো ব্যস্ততা। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই সাময়িক স্বস্তির শহরকে কি স্থায়ীভাবে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব, নাকি ঢাকার এই শান্ত রূপ কেবলই উৎসবের ক্ষণিক উপহার?
ইকরামুল হাসান 









