ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাতায় যখন ফেব্রুয়ারির আগমন ঘটে, তখন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই জনপদে বইতে শুরু করে এক কনকনে শীতল আবেগের হাওয়া। এ হাওয়া শুধু শীতের বিদায়বার্তা নয়, বরং বাঙালির গৌরব-গাঁথা আর অর্জনের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। ফেব্রুয়ারির প্রতিটি দিন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সেই মাস যখন স্লোগানে-মিছিলে রাজপথ রঞ্জিত করে বাঙালি তার প্রথম অধিকার ছিনিয়ে এনেছিল তাদেরই নিজস্ব মাতৃভাষা ‘বাংলা’।
রক্তের আঁচড়ে লেখা প্রথম বিজয়
১৯৫২ সালের সেই উত্তাল একুশে ফেব্রুয়ারি আজ থেকে ৭৪ বছর আগে যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল, তা আজ আর কেবল বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ৫২ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলার প্রতিটি বর্ণমালা হয়ে উঠেছে বাঙালির অলংকার ও অহংকার। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের সেই আত্মত্যাগ এখন বৈশ্বিক চেতনার নাম। তাঁদের তাজা রক্তেই কেনা হয়েছিল বিশ্বের বুকে নিজের ভাষায় কথা বলার সার্বভৌম অধিকার।
একুশ এখন বিশ্বজনীন
একসময় যা ছিল নিছক একটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর তা রূপ নিয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’। বর্তমানে পৃথিবীর ১৯০টিরও বেশি দেশে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় বাঙালির এই আত্মত্যাগকে। ৫৬ হাজার বর্গমাইল পেরিয়ে বাংলা ভাষা এখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে।এরই ধারাবাহিকতায় আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরালিয়নের মানুষদের মুখেও শোনা যায় আমাদের বাংলা ভাষার শ্রুতি। এটি যেন হাজার বছর ধরে চলা এক ‘গৌরবের রিলে রেস’, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম পরম মমতায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছে বর্ণমালার মশাল।
“ভাষা আন্দোলনের সেই অবিনাশী চেতনা আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করার দম্ভ। ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে কেবল শোকের নয়, বরং এক অপরাজেয় শক্তির উৎস।”
সমসাময়িক ভাবনা: বহমান বাংলা
সময়ের সাথে সাথে ভাষার ব্যবহার ও ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষে ভাষার সংমিশ্রণ কিংবা বিকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, বাঙালির কাছে উত্তর একটাই— “এসবই আমার ভাষা, আমার বাংলা ভাষা।” হাজার বছরের বিবর্তনে যে ভাষা টিকে আছে, তা আগামীতেও স্বমহিমায় টিকে থাকবে। কারণ এই ভাষার ভিত্তি কোনো সাধারণ পাথর নয়, বরং শহীদের তপ্ত রক্ত।
ফেব্রুয়ারি এলেই পলাশ-শিমুলের ডালে লাল রঙ লাগে, সেই লাল রঙের মাঝে আমরা খুঁজে পাই আমাদের অস্তিত্বকে। শহীদ মিনারের বেদিতে অর্পিত পুষ্পস্তবক কেবল ফুল নয়, তা হলো একটি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা।তাই তো আমি বাংলায় গান গাই,আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারির মতন কালজয়ী গানের ন্যায় ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারা কালের পরিক্রমায় রয়ে যাবে আমাদের আত্মার অন্তঃস্থলে।
ইকরামুল হাসান 


















